ফ্যাসিস্ট আমলে এক প্রতিবাদী কণ্ঠের নাম আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী
-এফ কে জুনেদ আহমদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু সময় এসেছে, যখন ভিন্নমত প্রকাশ করাই হয়ে উঠেছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী কণ্ঠ দমন, গুম-খুনের আতঙ্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নানামুখী চাপ সব মিলিয়ে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বহু রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব নীরব থাকলেও কিছু সাহসী মানুষ জনগণের পক্ষে কথা বলতে পিছপা হননি। তাদের মধ্যেই অন্যতম এক নাম আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী।
তিনি শুধু একজন ইসলামি বক্তা বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন বরং ন্যায়, সত্য এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন এক কণ্ঠস্বর। সমাজের সংকটময় সময়ে তাঁর বক্তব্য সাধারণ মানুষের মাঝে সাহস ও আশার সঞ্চার করেছে।
আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী বরাবরই অন্যায়, দুর্নীতি ও দমন, পীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল, তখন তিনি বিভিন্ন মাহফিল, জনসভা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন রাষ্ট্র কখনো জনগণের কণ্ঠরোধের যন্ত্র হতে পারে না বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাঁর এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ’র কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি সমাজসংস্কারমূলক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি তরুণ সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়, মাদক, সহিংসতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন করার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
দেশ-বিদেশে তাঁর অসংখ্য অনুসারী রয়েছে, যারা তাঁকে শুধু একজন আলেম নয়, বরং একজন মানবিক নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর বক্তৃতায় ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা, জনগণের দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
একটি কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে সাধারণ মানুষ যখন ভয়ের সংস্কৃতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোই হয়ে ওঠে আশার প্রতীক। আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী সেই প্রতীকগুলোর একটি। তিনি বারবার মানুষের মাঝে ঐক্য, নৈতিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন করতে পারে না।
ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা তাঁকে রাজনৈতিকভাবেও শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার বড় প্রমাণ।
তাঁর এ বিজয় ছিল জনগণের নীরব প্রতিবাদ এবং বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। কারণ মানুষ তাঁর মাঝে দেখেছিল একজন সাহসী, সৎ এবং জনগণের পক্ষে কথা বলা নেতৃত্বকে।
আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরীকে আলাদা করে তুলেছে তাঁর স্পষ্টবাদিতা। তিনি কখনো ক্ষমতার কাছে নত হননি, আবার জনতুষ্টির জন্যও সত্যকে আড়াল করেননি। তাঁর বক্তব্যে ছিল সাহস, যুক্তি এবং নৈতিক শক্তির সমন্বয়।
আজকের সময়ে যখন অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে নীরবতা বেছে নেয়, তখন তিনি জনগণের পক্ষে কথা বলে নিজেকে একটি প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ফ্যাসিস্ট ও দমনমূলক পরিবেশে সত্য বলা সবসময়ই কঠিন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্মরণ রাখে। আল্লামা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী তেমনই এক নাম, যিনি ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি অন্যায় ও দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
তিনি শুধু একজন আলেম নন বরং তিনি এক সাহসী কণ্ঠ, এক সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক, এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় মানুষের আশা-ভরসার একটি নাম।