
.
সৌন্দর্যের মায়াবী লীলাভূমি আমার প্রিয় সিলেট আজ এক অদৃশ্য বিষের নেশায় নীল হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়, চা-বাগান আর মাজারের এই পুণ্যভূমি সারা বিশ্বে তার আভিজাত্যের জন্য পরিচিত হলেও, গত সতেরো বছরে এটি মাদকের এক ভয়ংকর ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। মেঘালয় ও আসাম সীমান্ত পেরিয়ে আসা ইয়াবা, আইস ও কোকেনের স্রোতে আজ বিপন্ন সিলেটের তারুণ্য। এই বিষাক্ত কারবারের নেপথ্যে কাজ করছে এক শক্তিশালী ‘পুলিশ-নেতা-পাচারকারী’ সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় শীর্ষ গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্পের পাইকারি হেরোইন ব্যবসায়ী মো. সোহেল ওরফে ভূইয়া সোহেল এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাইকারি ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসায়ী মো. সেলিম ওরফে সেলিমের মতো হাজারো অপরাধীর নাম শনাক্ত করা হয়েছে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’, ‘ডেইলী আপন দেশ’ ও ‘নতুন সিলেট’-এর প্রতিবেদনে এই মরণঘাতী কারবারিদের দীর্ঘ তালিকা উঠে এলেও তারা আজো রহস্যজনকভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
সিলেটের প্রতিটি জেলা—সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার কি হবিগঞ্জ—সবখানেই পাহাড়ের বুক চিরে মাদকের নীল দংশন ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের দুর্গম পাহাড়ি পথে যখন ভারতীয় কোকেন কিংবা মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা প্রবেশ করে, তখন সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের চোখে ধুলো দেওয়াটা যেন এক নিয়মিত খেলায় পরিণত হয়েছে। ভোলাগঞ্জ কিংবা তামাবিলের মতো ব্যস্ততম সীমান্ত এলাকাগুলোতে পাথর আর কয়লা আমদানির আড়ালে ট্রাকের ভেতরে লুকিয়ে আসছে মরণ নেশার বড় বড় চালান। অথচ প্রশাসনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার দোহাই দেওয়া হলেও পুলিশের সরাসরি মদদে এই বিষ ছড়িয়ে পড়ছে অলিতে-গলিতে। এই ভয়াবহ সিন্ডিকেটে জড়িয়ে আছে সিলেটের দক্ষিণপাড়া কোম্পানীগঞ্জ এলাকার মো. জিয়া উদ্দিন (৩২), গোপালগঞ্জ পৌরসভার উত্তর রনকেলীর মো. আয়লাফ আহমদ ৪৫)-এর মতো অসংখ্য নাম।
সিলেট বিভাগে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট এলাকার কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’র অভিযোগ উঠেছে। তারা প্রকৃত অপরাধীদের ধরার বদলে মাসিক ‘বখরা’ আদায় করেন, আর টাকা দিতে অস্বীকারকারীদের মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি জব্দকৃত মাদকের একাংশ পুনরায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর অভিযোগও এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। বিজিবির পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্য চোরাচালানীদের জন্য যে ‘নিরাপদ পথ’ তৈরি করে দেন, তা এই জনপদের মানুষের সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এই অন্ধকার জগতের আসল কলকাঠি নাড়ছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও তাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’, যাদের অদৃশ্য ইশারায় বড় বড় অপরাধীরা থানা থেকে অনায়াসেই ছাড়া পেয়ে যায়। ২০২৫ সালের এক করুণ ঘটনায় দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ সীমান্তে এক মাদক বাহকের মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র নেপথ্যের গডফাদারদের আড়াল করার জন্য।
সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো—দেশে নতুন সরকার আসলো, মানুষ বুক ভরা আশা নিয়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখলো, কিন্তু সীমান্তের সেই পুরনো ক্ষত আজো শুকালো না। ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, স্লোগান বদলেছে, কিন্তু মাদক সিন্ডিকেটের থাবা এখনো আলগা হয়নি। প্রশাসনে রদবদল হলেও বাস্তবতা সেই অন্ধকার তিমিরেই রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের একটাই দীর্ঘশ্বাস—‘চেহারা পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেট তো একই রয়ে গেছে’। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা কেবল রাজনৈতিক রঙ পরিবর্তন করে এই মরণ নেশার কারবার টিকিয়ে রেখেছেন। আজ প্রবাসের মাটিতে বসে যখন নিজের জন্মভূমির এই ধ্বংসযজ্ঞের খবর শুনি, তখন কলিজা ছিঁড়ে যায়। সিলেট বিভাগকে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল সীমান্ত পাহারা দিলেই হবে না, বরং প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘কালো ভেড়া’ এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
প্রতিবেদক : শাহান আহমদ, সুরমা দর্পণ।