
১৫ জানুয়ারি (বুধবার) লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ফুলতলী ছাহেব বাড়ি সংলগ্ন বালাই হাওরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর ১৮তম ইন্তেকাল বার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল ঈসালে সাওয়াব মাহফিল। ধর্মীয় আবেগঘন পরিবেশ ও সুশৃঙ্খল এ মাহফিলে মুরিদীন-মুহিব্বীনের উদ্দেশ্যে তা’লীম-তরবিয়ত পেশ করেন আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরী উস্তাযুল উলামা ওয়াল মুহাদ্দিসীন, মুরশিদে বরহক হযরত আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ছাহেব ফুলতলী। তিনি বলেন, অতীতে মুসলমানদের উপর যারা যুলুম করেছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে ইয়াযীদ, এরপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ক্ষমতা রক্ষার জন্য শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। মানুষের উপর যুলুম করেছে। তারাও মুসলিম ছিল কিন্তু গদি রক্ষার জন্য মানুষের উপর যুলুম করেছে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাঈদ ইবন যুবায়র (রা.) কে হত্যা করেছে। যিনি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস, ইবন মাসউদ (রা.) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তাকওয়া, তাযকিয়া ও ইলম হাসিল করেছিলেন। তিনি যখন হাজ্জাজ বাহিনীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিলেন তখন ছোট মেয়েকে বলেছিলেন, তোমার মাকে বলো আমার গন্তব্য জান্নাত। তিনি দুআ করেছিলেন, হে আল্লাহ! আমার পর হাজ্জাজ যেন আর কারো উপর যুলুম করতে না পারে। তাঁর এ দুআ কবূল হয়েছিল। পনেরো দিনের মধ্যে হাজ্জাজ মৃত্যুবরণ করে। তিনি এ সময় দুআ করে বলেন, হে আল্লাহ! আমরা যেন কারো উপর যুলুম না করি, কেউ যেন আমাদের উপর যুলুম করার সুযোগ না পায়। প্রিয় মাতৃভূমিতে আমরা যেন হানাহানিতে লিপ্ত না হই।
তিনি আরো বলেন, নবী করীম সা. এর প্রতি আল্লাহ পাক সবচেয়ে বড় যে নেয়ামত দান করেছিলেন তা হলো কুরআন শরীফ। আল্লাহ হযরত ফুলতলী ছাহেব র. এর মাধ্যমে আমাদের এ নেয়ামতের হকদার বানিয়েছেন। কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত নির্ভরযোগ্য সনদে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। যারা বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেছেন আপনারা এ খিদমতে নিযুক্ত থাকবেন। ইন শা আল্লাহ, এ খিদমাত আমাদের হাওযে কাওছারে পৌঁছে দিবে।
তিনি বলেন, হিযবুল বাহার একটি মকবুল ওযীফা। শাহ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী র. বলেছেন, হিযবুল বাহার এমন দুআ, যা সব বিপদ আপদ থেকে হেফাজত করে। শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী বলেছেন যে তাকে হিযবুল বাহারের বিভিন্ন বিষয়ের রহস্য ইলহাম করা হয়েছে- যা তিনি হাওয়ামী নামক কিতাবে একত্রিত করেছেন। দুনিয়ার উদ্দেশ্য না করে নিয়ম মেনে হিযবুল বাহার নিয়মিত পড়লে উপকৃত হবেন। যাহিরী-বাতিনী দুশমন থেকে রক্ষার জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। যিকর-আযকারের ক্ষেত্রে সিলসিলার পদ্ধতির বাইরে অন্য নতুন কিছু করার চেষ্টা করবেন না। তাহলে সম্পর্ক কর্তিত হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, মা বাবার নির্দেশে বিধবা, এতীম-অনাথের নয়নের জল মোছার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, জানিনা কতটুকু সফল হয়েছি। বহু এতীমকে নিয়ে তাদের পিতার কবর যিয়ারত করেছি। তিনি আল্লামা ইকবালের একটি পংক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে এতীমের দুআ অত্যন্ত কার্যকরী। হাশরের দিনে এ দুআ বড় কাজে আসবে। ইনশাআল্লাহ, এর ওসীলায় আল্লাহ প্রিয়নবী সা. এর সাথে মিলিয়ে দিবেন। যাদের মা-বাবা আছেন তাদের খেদমত করবেন। যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের দুআয় স্মরণ রাখবেন, যিয়ারত করবেন। মা-বাবার কবর যিয়ারতে যে অনুভূতি তৈরি হয় অন্য কিছুতে তা পাওয়া যায় না। আসুন, মা বাবার খেদমত করি, এতীম-অনাথের খেদমতের দিকে ধাবিত হই, হিংসা বিদ্বেষমুক্ত মায়ার পরিবেশ গড়ে তুলি।
ওলীআল্লাহদের কাশফ সম্পর্কে তিনি বলেন, গোলাম মুহিউদ্দীন চিশতী র. আল্লামা ফুলতলী র. এর রামপুর আলিয়ার উস্তায ছিলেন। তাঁর নিকট বায়আত হওয়ার জন্য তিনি ফুলতলী ছাহেবকে বলেছিলেন। ফুলতলী ছাহেব তার পীর ও মুরশিদের বদরপুরী র. এর ইজাযত নেওয়ার কথা বলেন। ইতিমধ্যে বদরপুরী র. চিঠি পাঠান। চিঠি পৌঁছার আগেই গোলাম মহিউদ্দিন র. বলেন, ইজাযত মিলে গেছে। এটা ছিল কাশফ।
সকাল সাড়ে ১০টায় হাজারো এতীমসহ উপস্থিত মুরীদীন-মুহ্বিীনদের নিয়ে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর মাজার যিয়ারতের মধ্য দিয়ে মাহফিলের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর খতমে কুরআন, খতমে বুখারী, খতমে খাজেগান, খতমে দালাইলুল খাইরাতের পাশাপাশি স্মৃতিচারণমূলক ও জীবনঘনিষ্ট আলোচনায় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে অতিবাহিত হয় পুরো দিন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের সহাযোগী অধ্যাপক মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী ও ফুলতলী কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা নজমুল হুদা খান, মাসিক পরওয়ানা সম্পাদক মাওলানা রেদওয়ান আহমদ চৌধুরী ও জার্মানির এরফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরীর যৌথ পরিচালনায় মাহফিলে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রাসূলে পাক (সা.) এর ৩৯তম বংশধর, মদীনা শরীফের প্রখ্যাত বুযুর্গ সায়্যিদ আল হাবীব আসিম আদী ইয়াহইয়া ও জেদ্দার প্রখ্যাত বুযুর্গ সায়্যিদ আল হাবীব ওমর আহমদ আল হাবাশী। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিয়া মো. নূরুল হক, বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হযরত আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী, সিলেট সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ’র অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, চট্রগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শহীদুল হক প্রমুখ।
মাহফিলে বক্তব্য রাখেন মাওলানা শিহাব উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, মুফতী মাওলানা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা কমরুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ’র সভাপতি মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা এ.কে.এম মনোওর আলী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ইয়াকুবিয়া হিফযুল কুরআন বোর্ডের জেনারেল সেক্রে
নিজস্ব প্রতিনিধি 
















