Dhaka ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার : নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস। মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগরীর ২৩ নং ওয়ার্ড শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন। ইউসুফ আহমদ সাঈম সভাপতি, তানভীর আহমদ চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক সিলেটে তালামীযে ইসলামিয়ার ঈদে মীলাদুন্নবী (সা.) র‌্যালী বাস্তবায়ন কমিটি গঠন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সদস্য নির্বাচিত হলেন ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদ টাওয়ার হ্যামলেটস কেয়ারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত নেতৃত্বকে শাহান চৌধুরীর শুভেচ্ছা। তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগরীর ১৫ নং ওয়ার্ড শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন। বায়েজীদ আহমদ চৌধুরী সভাপতি, জামিল আহমদ মাফি সাধারণ সম্পাদক তালামীযে ইসলামিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন মহসিন আহমদ সভাপতি, আব্দুল বাছিত সাধারণ সম্পাদক ‎ ইউনিভার্সাল আইডিয়াল কলেজে ফল উৎসব ও বৃক্ষরোপণ-২০২৬ সফলভাবে অনুষ্ঠিত.. প্রবাসে ভর্তা উৎসব, বাঙালিয়ানার বন্ধনে কেয়ারারদের মিলনমেল অনুষ্ঠিত মোগলাবাজার থানার অভিযানে হানিট্র্যাপ ছিনতাই চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার ও ছিনতাইকৃত মোবাইল উদ্ধার:

রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার : নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস। মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ

রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার: নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস

রবিউল আউয়াল আমাদের দরজায় কড়া নাড়লেই হৃদয়ের গভীরে যেন একটি পবিত্র স্মৃতি জেগে ওঠে। এটি সেই মাস, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা, আহমাদ মুজতাবা ﷺ-এর জন্মের স্মৃতি। তাই আশেকে রসূলদের অনেকেই এ মাসকে বলেন—‘রবিউল আনওয়ার’, অর্থাৎ নূরের বসন্ত।

রবিউল আউয়াল হিজরি সনের তৃতীয় মাস। ‘রবিঈ’ শব্দের অর্থ বসন্ত; আর ‘আউয়াল’ অর্থ প্রথম। অর্থাৎ এটি প্রথম বসন্ত। আর মুমিন-মুসলমানের হৃদয়ে এ মাস আরেকটি বসন্ত—নবীপ্রেমের বসন্ত।

ঐতিহাসিকভাবে ‘রবিউল আউয়াল’ নামকরণের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু নবীপ্রেমিক হৃদয়ের কাছে এ মাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—এ মাস আমাদের প্রিয় নবী ﷺ-এর আগমনের স্মৃতি বহন করে।

যেদিন তিনি পৃথিবীতে এলেন, সেদিন শুধু খাজা আবদুল্লাহ ও আমীনা রা. এর পবিত্র ঘরই আলোকিত হয়নি; তাঁর আগমনের মাধ্যমে মানবতার সামনে হিদায়াতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। শিরকের অন্ধকারের মধ্যে তাওহিদের নূর, জাহেলিয়াতের মধ্যে জ্ঞানের আলো, নিষ্ঠুরতার মধ্যে রহমতের ছায়া এবং বিভেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”—সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭

তাই ‘রবিউল আনওয়ার’ নামটি হৃদয়ে এক গভীর অনুভূতি জাগায়—যে মাসে রহমতের নবী ﷺ-এর আগমনের স্মৃতি রয়েছে, সে মাস মুমিনের হৃদয়ে ভালোবাসার আলো জ্বালাবে না কেন?

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এ বিষয়ে সহীহ হাদীস রয়েছে। হযরত আবু কাতাদা আনসারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—

«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ ـ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ»

“এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর ওহি নাজিল করা হয়েছে।” —সহিহ মুসলিম

এই হাদিসটি আমাদের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করার মতো। নবীজি ﷺ তাঁর জন্মের দিনকে স্মরণ করেছেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে—সোমবার রোজা রেখে। অর্থাৎ নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়; নবীপ্রেমের সৌন্দর্য হলো শুকরিয়া, ইবাদত, দরূদ, সীরাতচর্চা ও সুন্নাহ অনুসরণ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের বছর হিসেবে আমুল ফীল বা হাতি বছরের কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ। তবে রবিউল আউয়াল মাসের কোন তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল—এ বিষয়ে আলেম ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে এর মধ্যে ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতগুলোর একটি এবং বহু যুগ ধরে মুসলিম সমাজে এ তারিখে মীলাদুন্নবীর স্মরণ করা হয়ে আসছে। তাই এ বিষয়ে ভালোবাসা থাকবে, আবেগ থাকবে; কিন্তু মতভেদের ক্ষেত্রে শিষ্টতা ও আলেমদের প্রতি সম্মানও থাকবে।

কারণ এ মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে সেই নূরের কথা, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। তিনি এসেছিলেন মানুষকে মানুষকে সিজদা করা থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর সামনে মাথা নত করতে শেখাতে। তিনি এসেছিলেন অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে। তিনি এসেছিলেন বিভক্ত হৃদয়কে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে। তিনি এসেছিলেন দুর্বল, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি এসেছিলেন এমন এক আদর্শ নিয়ে, যার সৌন্দর্য দেখে শত্রুও বন্ধু হয়ে যেত।

তাই তাঁর জন্মের স্মৃতি যখন ফিরে আসে, একজন মুমিনের হৃদয়ে ভালোবাসার ঢেউ ওঠে। চোখে পানি আসে। ঠোঁটে দরূদ আসে। অন্তরে সীরাতের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। এটাই রবিউল আনওয়ার—নবীপ্রেমের আলোয় হৃদয়কে আবার আলোকিত করার সময়।

আল্লামা কাস্তাল্লানি (রহ.) মীলাদুন্নবীর রাতের ফজিলত সম্পর্কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন, তিনি মীলাদুন্নবীর রাতকে লাইলাতুল কদরের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ বলার পক্ষে কয়েকটি দিক উল্লেখ করেছেন।

তিনি যুক্তি হিসেবে বলেন—লাইলাতুল কদরের মর্যাদা হলো, এ রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে; আর মীলাদুন্নবীর রাতের মর্যাদা হলো, এ রাতেই সেই মহান নবীর আগমন ঘটেছে, যাঁর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে এবং যাঁর মাধ্যমে কুরআনের শিক্ষা পৃথিবীতে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। লাইলাতুল কদরের ফজিলত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ; পক্ষান্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমত দুনিয়া ও আখিরাতজুড়ে বিস্তৃত। (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া

এ বক্তব্যের মূল আবেদন আমাদের হৃদয়ে একটি গভীর উপলব্ধি জাগিয়ে দেয়—আমরা যে কুরআন পেয়েছি, যে ঈমান পেয়েছি, যে হিদায়াতের পথ পেয়েছি, সেই মহান রাসূলের আগমন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি।

রবিউল আউয়াল শুধু আবেগের মাস হয়ে থাকুক—এটা নয়। এ মাস আমাদের জীবনে পরিবর্তনের মাস হোক আমরা যদি সত্যিই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর সুন্নাহ আমাদের পোশাকে, কথায়, ব্যবহারে, পরিবারে, ব্যবসায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণে এবং আমাদের পুরো জীবনব্যবস্থায় ফুটে উঠুক।

এ মাসে আমরা দরূদ ও সালাম বেশি বেশি পাঠ করি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত পাঠ করি। তাঁর চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করি। কুরআন কারীমের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করি। গরিব-মিসকিন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। এবং নিজের জীবনকে সুন্নাহর আলোয় সাজানোর চেষ্টা করি। কারণ, নবীপ্রেমের সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ হলো নবীর ﷺ অনুসরণ।

রবিউল আউয়াল আমাদের শুধু একটি তারিখ মনে করিয়ে না দিক; বরং আমাদের মনে করিয়ে দিক—আমরা কার উম্মত! আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি উম্মতের জন্য কেঁদেছেন। আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি তায়েফের নির্যাতনের পরও তাদের হিদায়াতের আশা করেছেন।
আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি মৃত্যুশয্যাতেও উম্মতের কথা স্মরণ করেছেন। আমরা সেই নবীর উম্মত, যাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলা দরূদ পাঠান এবং ফেরেশতারা দরূদ পাঠান। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করো।” —সূরা আল-আহযাব: ৫৬

তাই আসুন, রবিউল আউয়ালের এই পবিত্র স্মৃতিকে আমরা শুধু উৎসবের আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে ঈমান, ভালোবাসা, দরূদ, সীরাত ও সুন্নাহর সঙ্গে নিজেদের নতুন করে যুক্ত করি।

হৃদয়ের অন্ধকার দূর হোক নবীপ্রেমের আলোয়।
জীবনের অস্থিরতা দূর হোক সুন্নাহর ছায়ায়।
চোখের পানি ঝরুক তাঁর সীরাত স্মরণে।
ঠোঁট সিক্ত থাকুক দরূদ ও সালামে।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার হাবীব ﷺ-এর সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন। তাঁর সুন্নাহকে আমাদের জীবনের আলো বানিয়ে দিন। তাঁর প্রতি অগণিত দরূদ ও সালাম পাঠ করার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সান্নিধ্য ও শাফায়াত নসিব করুন।

اللهم صل وسلم وبارك على سيدنا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين

আরও পড়ুনঃ  তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগরীর ২৩ নং ওয়ার্ড শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন। ইউসুফ আহমদ সাঈম সভাপতি, তানভীর আহমদ চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক

রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার : নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস। মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ

রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার : নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস। মাওলানা বদরুজ্জামান রিয়াদ

আপডেটের সময়: ১১:০২:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

রবিউল আউয়াল—রবিউল আনওয়ার: নূরের মাস, নবীপ্রেমের মাস

রবিউল আউয়াল আমাদের দরজায় কড়া নাড়লেই হৃদয়ের গভীরে যেন একটি পবিত্র স্মৃতি জেগে ওঠে। এটি সেই মাস, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা, আহমাদ মুজতাবা ﷺ-এর জন্মের স্মৃতি। তাই আশেকে রসূলদের অনেকেই এ মাসকে বলেন—‘রবিউল আনওয়ার’, অর্থাৎ নূরের বসন্ত।

রবিউল আউয়াল হিজরি সনের তৃতীয় মাস। ‘রবিঈ’ শব্দের অর্থ বসন্ত; আর ‘আউয়াল’ অর্থ প্রথম। অর্থাৎ এটি প্রথম বসন্ত। আর মুমিন-মুসলমানের হৃদয়ে এ মাস আরেকটি বসন্ত—নবীপ্রেমের বসন্ত।

ঐতিহাসিকভাবে ‘রবিউল আউয়াল’ নামকরণের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু নবীপ্রেমিক হৃদয়ের কাছে এ মাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—এ মাস আমাদের প্রিয় নবী ﷺ-এর আগমনের স্মৃতি বহন করে।

যেদিন তিনি পৃথিবীতে এলেন, সেদিন শুধু খাজা আবদুল্লাহ ও আমীনা রা. এর পবিত্র ঘরই আলোকিত হয়নি; তাঁর আগমনের মাধ্যমে মানবতার সামনে হিদায়াতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। শিরকের অন্ধকারের মধ্যে তাওহিদের নূর, জাহেলিয়াতের মধ্যে জ্ঞানের আলো, নিষ্ঠুরতার মধ্যে রহমতের ছায়া এবং বিভেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”—সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭

তাই ‘রবিউল আনওয়ার’ নামটি হৃদয়ে এক গভীর অনুভূতি জাগায়—যে মাসে রহমতের নবী ﷺ-এর আগমনের স্মৃতি রয়েছে, সে মাস মুমিনের হৃদয়ে ভালোবাসার আলো জ্বালাবে না কেন?

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছিলেন—এ বিষয়ে সহীহ হাদীস রয়েছে। হযরত আবু কাতাদা আনসারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—

«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَوْمٌ بُعِثْتُ ـ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ»

“এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর ওহি নাজিল করা হয়েছে।” —সহিহ মুসলিম

এই হাদিসটি আমাদের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করার মতো। নবীজি ﷺ তাঁর জন্মের দিনকে স্মরণ করেছেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে—সোমবার রোজা রেখে। অর্থাৎ নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়; নবীপ্রেমের সৌন্দর্য হলো শুকরিয়া, ইবাদত, দরূদ, সীরাতচর্চা ও সুন্নাহ অনুসরণ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের বছর হিসেবে আমুল ফীল বা হাতি বছরের কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ। তবে রবিউল আউয়াল মাসের কোন তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল—এ বিষয়ে আলেম ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে এর মধ্যে ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতগুলোর একটি এবং বহু যুগ ধরে মুসলিম সমাজে এ তারিখে মীলাদুন্নবীর স্মরণ করা হয়ে আসছে। তাই এ বিষয়ে ভালোবাসা থাকবে, আবেগ থাকবে; কিন্তু মতভেদের ক্ষেত্রে শিষ্টতা ও আলেমদের প্রতি সম্মানও থাকবে।

কারণ এ মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে সেই নূরের কথা, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। তিনি এসেছিলেন মানুষকে মানুষকে সিজদা করা থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর সামনে মাথা নত করতে শেখাতে। তিনি এসেছিলেন অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে। তিনি এসেছিলেন বিভক্ত হৃদয়কে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে। তিনি এসেছিলেন দুর্বল, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি এসেছিলেন এমন এক আদর্শ নিয়ে, যার সৌন্দর্য দেখে শত্রুও বন্ধু হয়ে যেত।

তাই তাঁর জন্মের স্মৃতি যখন ফিরে আসে, একজন মুমিনের হৃদয়ে ভালোবাসার ঢেউ ওঠে। চোখে পানি আসে। ঠোঁটে দরূদ আসে। অন্তরে সীরাতের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়। এটাই রবিউল আনওয়ার—নবীপ্রেমের আলোয় হৃদয়কে আবার আলোকিত করার সময়।

আল্লামা কাস্তাল্লানি (রহ.) মীলাদুন্নবীর রাতের ফজিলত সম্পর্কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন, তিনি মীলাদুন্নবীর রাতকে লাইলাতুল কদরের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ বলার পক্ষে কয়েকটি দিক উল্লেখ করেছেন।

তিনি যুক্তি হিসেবে বলেন—লাইলাতুল কদরের মর্যাদা হলো, এ রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে; আর মীলাদুন্নবীর রাতের মর্যাদা হলো, এ রাতেই সেই মহান নবীর আগমন ঘটেছে, যাঁর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে এবং যাঁর মাধ্যমে কুরআনের শিক্ষা পৃথিবীতে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। লাইলাতুল কদরের ফজিলত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ; পক্ষান্তরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমত দুনিয়া ও আখিরাতজুড়ে বিস্তৃত। (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া

এ বক্তব্যের মূল আবেদন আমাদের হৃদয়ে একটি গভীর উপলব্ধি জাগিয়ে দেয়—আমরা যে কুরআন পেয়েছি, যে ঈমান পেয়েছি, যে হিদায়াতের পথ পেয়েছি, সেই মহান রাসূলের আগমন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি।

রবিউল আউয়াল শুধু আবেগের মাস হয়ে থাকুক—এটা নয়। এ মাস আমাদের জীবনে পরিবর্তনের মাস হোক আমরা যদি সত্যিই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর সুন্নাহ আমাদের পোশাকে, কথায়, ব্যবহারে, পরিবারে, ব্যবসায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণে এবং আমাদের পুরো জীবনব্যবস্থায় ফুটে উঠুক।

এ মাসে আমরা দরূদ ও সালাম বেশি বেশি পাঠ করি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত পাঠ করি। তাঁর চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করি। কুরআন কারীমের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করি। গরিব-মিসকিন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। এবং নিজের জীবনকে সুন্নাহর আলোয় সাজানোর চেষ্টা করি। কারণ, নবীপ্রেমের সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ হলো নবীর ﷺ অনুসরণ।

রবিউল আউয়াল আমাদের শুধু একটি তারিখ মনে করিয়ে না দিক; বরং আমাদের মনে করিয়ে দিক—আমরা কার উম্মত! আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি উম্মতের জন্য কেঁদেছেন। আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি তায়েফের নির্যাতনের পরও তাদের হিদায়াতের আশা করেছেন।
আমরা সেই নবীর উম্মত, যিনি মৃত্যুশয্যাতেও উম্মতের কথা স্মরণ করেছেন। আমরা সেই নবীর উম্মত, যাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলা দরূদ পাঠান এবং ফেরেশতারা দরূদ পাঠান। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করো।” —সূরা আল-আহযাব: ৫৬

তাই আসুন, রবিউল আউয়ালের এই পবিত্র স্মৃতিকে আমরা শুধু উৎসবের আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে ঈমান, ভালোবাসা, দরূদ, সীরাত ও সুন্নাহর সঙ্গে নিজেদের নতুন করে যুক্ত করি।

হৃদয়ের অন্ধকার দূর হোক নবীপ্রেমের আলোয়।
জীবনের অস্থিরতা দূর হোক সুন্নাহর ছায়ায়।
চোখের পানি ঝরুক তাঁর সীরাত স্মরণে।
ঠোঁট সিক্ত থাকুক দরূদ ও সালামে।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার হাবীব ﷺ-এর সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন। তাঁর সুন্নাহকে আমাদের জীবনের আলো বানিয়ে দিন। তাঁর প্রতি অগণিত দরূদ ও সালাম পাঠ করার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সান্নিধ্য ও শাফায়াত নসিব করুন।

اللهم صل وسلم وبارك على سيدنا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين

আরও পড়ুনঃ  তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগরীর ২৩ নং ওয়ার্ড শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন। ইউসুফ আহমদ সাঈম সভাপতি, তানভীর আহমদ চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক