
হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের হাতে-কলমে রেখেছিল সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতিতে। সেই সুপ্রাচীন নতুনের সঙ্গে মিশে ছিল আমাদের ধর্ম, লোকাচার ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। কালের আবর্তনে সামাজিক ও বৈশ্বিক প্রাকৃতিক পরিবর্তনের আর সমাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের সংস্কৃতি। সমস্যায় জর্জরিত আমাদের সমাজ কাঠামো। লোক শিল্প, লোকসংগীত, লোকনৃত্য, মাটির কাজ, লোককথা, লোকগাথা, লোকখেলা, লোকঐতিহ্য ও লোকসংস্কারসমূহ। ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, স্থাপনা, আমাদের লোকায়ত জীবনের অঙ্গ। আমাদের পোশাক, পরিচ্ছদ, লোকশিল্প, খাবার, খেলাধুলা, আমাদের লোকসাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, ধর্মীয় উৎসব, পূজা-পার্বন, মেলা, লোকগাথা, লোকনৃত্য, নাটক, লোকচিত্রকলা, লোকসংগীত এবং আমাদের লোকনৃত্য যা আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি, প্রাণবন্ত ও প্রাণচঞ্চলতা ফিরিয়ে আনে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবসমূহ যা সমাজে সম্প্রীতি, ঐক্য ও মানবতাবোধ সৃষ্টি করে।
আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনেক। প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। এটি আমাদের ইতিহাস, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আধুনিকায়ন ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পোশাক, খাবার, আচার-আচরণ ও উৎসবগুলোতে পশ্চিমা সংস্কৃতির ছাপ দেখা যায়। আমাদের তরুণ প্রজন্ম পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভুলতে বসেছে। আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে না পারলে আমরা আমাদের পরিচয় ও ঐতিহ্য হারাব। তাই, আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের লোকশিল্প ও হস্তশিল্প অনেক সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়। নকশিকাঁথা, মাটির কাজ, বাঁশ ও বেতের কাজ, শঙ্খশিল্প, পাটের কাজ, ইত্যাদি আমাদের লোকশিল্পের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই শিল্পগুলোও আজ বিলুপ্তির পথে। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে হস্তশিল্পের বাজার কমে যাচ্ছে এবং শিল্পীরাও তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
লোকসংগীত ও লোকনৃত্য আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, মুর্শিদি, ইত্যাদি আমাদের লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারা। এই গানগুলো আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও প্রকৃতির কথা বলে। কিন্তু আধুনিক গানের প্রভাবে লোকসংগীত আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। পিঠা, পায়েস, হাতে বানানো রুটি, ইত্যাদি আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের কিছু উদাহরণ। এই খাবারগুলো আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু ফাস্ট ফুডের প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলোও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। লুঙ্গি, শাড়ি, ধুতি, পাঞ্জাবি, ইত্যাদি আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কিছু উদাহরণ। এই পোশাকগুলো আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু পশ্চিমা পোশাকের প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। হা-ডু-ডু, কবাডি, গোল্লাছুট, বউচি, ইত্যাদি আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার কিছু উদাহরণ। এই খেলাধুলাগুলো আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু আধুনিক খেলার প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে প্রচার ও প্রসার করতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে আমরা আমাদের পরিচয় ও ঐতিহ্য হারাব। তাই, আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
লেখকঃ সাংবাদিক মামুনুর রশিদ
মোঃ মামুনুর রশিদ 









